শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৩০ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে টিডিএসে খোলা হয়েছে শোক বই বেগম জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় ট্রাফিক স্কুলে দোয়া মাহফিল স্কুল অব লিডারশিপ এর আয়োজনে দিনব্যাপী পলিটিক্যাল লিডারশিপ ট্রেনিং এন্ড ওয়ার্কশপ চাঁদপুরে সাহিত্য সন্ধ্যা ও বিশ্ববাঙালি মৈত্রী সম্মাননা-২০২৫ অনুষ্ঠিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় টিডিএসে দোয়া মাহফিল সব্যসাচী লেখক, বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদী: সিলেট থেকে বিশ্ব সাহিত্যে কসবায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের পক্ষে নেতাকর্মীদের গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরন ৭ই নভেম্বর: সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এখন কবি আল মাহমুদের সময় দৈনিক ঐশী বাংলা’র জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন ১৭ জানুয়ারি-‘২৬ ঢাকার বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে
জোৎস্নায় বেহাগের সুর

জোৎস্নায় বেহাগের সুর

মিনা মাশরাফী
শায়লা আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরেছে। অনিকের অফিস ছুটি হয় বিকাল পাঁচটায়। শায়লা অনিককে ফোন করে জানিয়ে দেয় : হ্যালো অনিক আমি বাসায় ফিরেছি ,তুমিও একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে পারলে একসাথে বিকেলের চা খাওয়া যাবে .. আমি তোমার পছন্দের পায়েশ আর পাকুড়া বানাচ্ছি।
বাইরের কাপড় ছেড়ে ফ্রেস হয়ে নিল শায়লা। টুকিটাকি ঘরের কাজ গুছাতে গুছাতে পূর্নিমার কথা খুব মনে পড়ছে..পৃথিবীর নিয়মটা এমন কেন ? সন্তানেরা বড় হয়ে গেলে তাদের লেখাপড়া কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে দূরে চলে যেতে দিতে হয়, মা’ বাবা’র বুকটা ফাঁকা করে দিয়ে। শায়লার মোটেও ভাল লাগেনা একা সময় কাটাতে। সে জন্যে বাসায় ফিরেই অনিককে তাড়াতাড়ি ফেরার জন্য ফোন করেছে। কোন কোন দিন নিজের অফিস থেকে আগে ছুটি পেয়ে গেলে সোজা অনিকের অফিসে চলে যায় শায়লা, একসাথে ফেরে।
ঘরের কাজ সেরে রান্না ঘরের দিকে পা’ বাড়াতেই ডোর বেলটা বেজে উঠলো.. নিশ্চই অনিক.. একটু এগিয়ে দরজা খুলতেই.. অনিক চম্কে দিল শায়লাকে, আচম্কা জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে একটু আদর করে দিল,শায়লা মিস্টি হেসে অনিকের গাল জোরে টিপে দিল।এমন মধুর খুনসুটিতে দু’জনের কেটে যাচ্ছে সময়। বিয়ের ২৫ বছর পেরিয়ে গেছে তারপরও মনে হয় না কিভাবে কেটে গেল সোনালী আবেগ আপ্লুত অম্লমধুর মুহূর্তগুলো।
অনিক ফ্রেস হয়ে এসো ..আমি চায়ের পানি বসিয়েছি .. নিয়ে আসছি।
ঘন দুধের মিস্টি পায়েশ আর মচ্মচ্ েপাকুড়া দিয়ে চায়ের টেবিলে নানান কথার ফুলঝুরিতে চা-পর্বের শেষান্তে বিকেল গড়িয়ে সন্ধায় লালিমার রেশ কেটে জো¯œার প্লাবন নেমে এলো।
শায়লা ঘরগুলিতে আলো জ্বেলে দিয়ে ড্রইং রুমে বসতে গেল… পাশের ঘর থেকে অনিক শায়লাকে ডাকছে .. শায়লা এদিকে এসো দেখে যাও … শায়লা অনিকের ডাকে কাছে আসে, অনিক শায়লাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলে.. আকাশের দিকে তাঁকিয়ে দেখো.. আজ মনে হয় পূর্নিমা ! কেমন ঢল ঢল জোৎস্না। স্নিগ্ধআলোর ভেলায় আকাশটা ভাসছে ..।

জানালা দিয়ে চাঁদের আলো শায়লার চোখে মুখে ছড়িয়েছে.. অপুর্ব লাগছে শায়লাকে.. অনিক লায়লার হাত ধরে বলে.. চলো বারান্দায় যাই..। অনিক শায়লার হাত ধরে বারান্দা থেকে নেমে আসে রাস্তায় .. দেখো মেহগিনি আর ইউক্লিপটাসের শিশু গাছগুলি জোৎস্না মেখে মিস্টি বাতাসে আনন্দে মাতাল। রাস্তার লাইট পোস্টের সোডিয়াম আলোগুলি রুপালী জোৎস্নার প্লাবনে ম্লান হয়ে আছে। ঝিলের জলে চাঁদের আলোর ঝিলিক চিক্ চিক্ করছে.. চাঁদনী রাতের পেলবতায় আপ্লুত..দু’জনে। থাকে উত্তরার কাছাকাছি দিয়াবাড়ি এলাকায়.. উন্নয়নশীল উপশহরে গ্রামের আমেজ এখনো কাটেনি। আশ্বিন মাস..বিস্তৃত এলাকা জুড়ে কাঁচা পাকা ধানক্ষেত… মৌ মৌ ধানের সুবাস, এই পূর্নিমা রাতে সবুজ শ্যামল সোনালী ফসলের ক্ষেতে দুধ জোৎস্নার মাখামাখি রুপালী আবেশ। ছোট বড় বন বনানীর গাছের পাতার ফাঁকে আলো ছায়ার লুকোচুরী… ভারী চমৎকার মায়াবী জোৎস্নায় উন্মমনা পরিবেশ.. মনে প্রেমের শিহরন উথাল পাথাল ঢেউ, হৃদয়ে সঙ্গীতের সুর গুনগুনিয়ে ঠোঁটের কোনায়.. কি এক অপুর্ব অনুভ’তি দেহবল্লভে, হৃদয়ে স্পন্দন মিহি সুর।
আকাশের গায়ে জ্বলজ্বল জোৎস্নায় একবুক অনন্ত যৌবন নিয়ে ওরা মিলেছিল একদিন ভালবাসার আলিঙ্গনে। মতিহারের প্যারিস রোডের সারি সারি দেবদারু বনে হাত ধরে হেঁটেছিল, বসেছিল ঝিরিঝিরি বাবলা গাছের তলে ঘনসবুজ ঘাসের গালিচায়। বাদাম চানাচুর, নটকল, আমলকি, চালতা আচার নিয়ে আসতো বড়, ছোট, শিশু ফেরিওয়ালা। রবীন্দ্র স্বরনী চত্বরে বন্ধুরা মিলে কত আড্ডাই না হত.. ‘শায়লা-অনিক’ জুটিকে সবাই জানতো ‘ওরা আর জনমের সঙ্গী’ দূর পথ পাড়ি দিয়েছিল কোজাগরী জোৎস্নায়। পরিনত ভালবাসার পরিনয়ে ২৬টি বসন্ত পার করেছে প্রেমের সরোবরে। স্নেহপ্রবন পিতা মাতার ভুমিকাও পালন করে চলেছে সগৌরবে।
অকস্মাৎ বিশ্বময় করোনা’ কোভিট-১৯ …ভয় আতঙ্ক ! হতাশায় জীবন চলার গতিতে ছন্দপতন এনে দিল। সুস্থ থাকার তাগিদে স্বেচ্ছায় ঘরবন্দী জীবন। ওদের সিঞ্চিত ভালবাসার ফসল.. পূর্নিমা ধানমন্ডি স্যানিডেল স্কুল থেকে এ’ লেবেল শেষ করে কানাডায় টরেন্টোর ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটর সায়েন্স নিয়ে পড়ছে। গত মে’-জুন ২০২০ এ দেশে আসবার কথা ছিল। দেশে আসা হয় নাই .. কোভিট – ১৯ এর প্রকট প্রভাব পূর্নিমার বড় আশা ছিল.. দেশে ফিরবে মহা আনন্দ বুকে, পিতৃ মাতৃ ¯স্নেহের স্বর্গ নীড়ে.. মমতার আঁচলে উষ্ণ আদরে সিক্ত হবে।
‘করোনা’কাল কেটে যাবে পরিবেশ সহনীয় হবে…আশায় আশায় অপেক্ষার প্রহর প্রলম্বিত হতে থাকে। শায়লা- অনিক দু:শ্চিন্তার অতলে। প্রতিটি প্রহর কাটে বির্মষতায়। সন্তানকে কাছে পাবার হাহাকার বুকে ব্যথা বাড়ায়।

লকডাউন, রেডজোন, ইয়েলো জোন, গ্রীনজোন, সোস্যাল ডিসটেন্স, হাতধোয়া..মাস্ক ব্যাবহার, আদা, মসলা লেবু চা, গরম পানি খাওয়া নিয়ম মেনে চলতে চলতে জীবন ধৈযের্র প্রান্তিক পর্যায়ে.. টেনে টেনে চলছে গৃহবন্দী নিরানন্দ জীবন। দৈনন্দিন প্রয়োজনে বাইরে না গেলে চলেনা। কাজের বুয়াকেও বাদ দিতে হয়েছে। সংসারের কাজ করে নিচ্ছে দু’জনে।
প্রতিবছর পৌষ পার্বনে পিঠে খাওয়ার উৎসবে গ্রামের বাড়ী যাওয়া হতো নিয়মিত। বৈশ্বিক করোনা ’কালে তাও বাতিল। শায়লার মন কেমন করে উঠে.. একেবারে নিরামিষ চলমান জীবনে একটু ভাললাগাতে.. নিজেই বাজার থেকে চাল কিনে এনে ব্লান্ডারে গুড়ি বানিয়ে পিঠা করে, পায়েশ রান্না করে,চালের আটার রুটি সাথে হাঁসের মাংস ভুনা করে অনিককে খেতে দেয়, পুর্ণিমার চেয়্রাটা ফাঁকা ! দু’জনের বুকের গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, শায়লার কপোল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। নীরবতা ভেঙ্গে অনিক শায়লাকে বলে.. শুকনো করে মা’মনির পছন্দের তেল পিঠা, নারকেল পুলি বানিয়ে দাও..পাঠিয়ে দেই, ঈদের সময় যেভাবে ড্রেসগুলি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। অনিকের কথায় শায়লার মনটা ভাল লাগছে.. বললো ঠিক আছে সে ব্যবস্থাই করি।
অনিক চুপচাপ হয়ে গেছে.. শায়লার ভিতরে অস্থিরতা গুমরে মরে। অনিক শায়লার স্বর্গনীড়ে ভালবাসার খুনসুটি ধুসর মলিন.. নিস্তব্ধতায় সুন্সান্ বাড়ীটা। পূর্নিমার ফোন আসলে কেবল স্বরগরম হয়ে উঠে.. ওপার থেকে পূর্নিমা বলে বাবা’মা’ তোমরা অমন শান্ত হয়ে গেছ কেন? হাসছো না মোটেও.. আমি ভাল আছি, তোমাদেরকে অমন দেখলে আমি ভাল থাকবো কি ভাবে ? সারা বিশ্বে তো একই অবস্থা! পরিস্থিতির পরিবর্তন একদিন হবে। শায়লা মুখে হাসি টেনে বলে.. না মা’ আমরা ভাল আছি, কতদিন দেখা হয় না .. ভাল থেকো সোনা। নিয়ম মেনে চলবে, খাওয়ার দিকে নজর দিও।
বাবা-মায়ের মানসিক অবস্থা দেখে ভাল লাগে না পূর্নিমার, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে দেশে ফিরবে। যদিও এ সময় দেশে ফিরলে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে, যাওয়ার আগে কোভিড টেস্ট করতে হবে। কোভিড- ১৯ এর নেগেটিভ রিপোর্ট দেখিয়ে তবে টিকিট কনফর্ম হবে । পরদিনই মা’কে জানিয়ে দিল পূর্নিমা, মা’আমি দেশে ফেরার ব্যবস্থা নিচ্ছি ,কনফর্ম হলে জানাবো, চিন্তা করোনা.. খুব ভাল থাকতে হবে।
অনিক- শায়লা… চিন্তায় পড়ে গেল.. ওকে কাছে পাবার যেমন আনন্দ বুকে.. অন্য দিকে ২য় ওয়েভ এর শঙ্কায় বুক কাঁপছে।

পূর্নিমার দেশে ফেরার তারিখটার জন্য অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছে দু’জনে.. অপেক্ষার প্রহর প্রলম্বিত হতে থাকে .. আসে না খবর.. অবশেষে অনিক ম্যাসেন্জারে ফোন করে.. নো এ্যানসার, বহুবার নো এ্যানসার, প্রতিদিন নো এ্যানসার। একদিন ওয়াটস এ্যাপে অচেনা নম্বর থেকে কল আসে.. আঙ্কেল আপনি কি পূর্নিমার বাবা ? অনিক চম্কে উঠে হ্যাঁ হ্যাঁ আমি পূর্নিমার বাবা ..পূর্নিমার খবর কি..? আমি ওর সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না..কে তুমি ? ..আমি পূর্নিমার সহপাঠি,পূর্নিমার করোনা হয়েছে,এখন আই সিই ইউ এ সিভিয়ার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, দোয়া করবেন আঙ্কেল। এ নাম্বারে খবর পাবেন, পরে জানাবো এখন রাখি।
প্রদীপের শিখাটি নিভে গেল..নির্বাক স্মৃতি ফিকে হয়ে যাওয়া সোনাধন.. একবুক অনন্ত আশা নিয়ে দূর পথে পাড়ি দিয়েছিল কোজাগরী জোৎস্নায়। স্বপ্ন ছিল ফিরবে মহা আনন্দ বুকে। সেদিনও চাঁদনী রাত ছিল.. সকালে সোনাঝরা রোদ ছিল .. তবু না ফেরার দেশে পাড়ি দিল… ¯স্নেহ ভালবাসার ডালি হাতে অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়ে গেল করোনার কোপানলে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD